পরিবেশ দূষণে ব্যক্তিগত গাড়ি | World Car Free Day | TmA

 


পরিবেশ দূষণে ব্যক্তিগত গাড়ি | World Car Free Day | TmA 


Written by : Tanvir Mahatab Abir


"বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন নাজমুস সাকিব। সঠিক সময়ে মতিঝিলের অফিসে পৌঁছানোর জন্য তাকে বাসা থেকে বের হতে হয় অন্তত ঘন্টা দুয়েক আগে। সাকিব বলছিলেন, “অথচ ঈদের ঠিক দুইদিন পর ফাঁকা রাস্তায় বাসা থেকে আধঘন্টা আগে বেরিয়েই অফিসে পৌঁছাতে পেরেছি৷”


ঢাকার চিরাচরিত জ্যামের কারণে সাকিবের মত অসংখ্য কর্মজীবী মানুষের প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় কাটাতে হচ্ছে। এই জ্যামের অন্যতম কারণ রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে অনুৎসাহিত করতে প্রতিবছর ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস হিসেবে।


জ্যামের কারণ ব্যক্তিগত গাড়ি


ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা প্রায় আড়াই লক্ষাধিক।  বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপ1ক্ষ (বিআরটিএ) বলছে, প্রতিদিন গড়ে ৫৩টি নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি ঢাকার রাস্তায় নামছে। ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহ্রত ছোট আকারের এই গাড়িগুলো ঢাকার রাস্তার প্রায় ৭৬ শতাংশ জায়গাই দখল করে আছে। এতে করে প্রতিদিনই নগরবাসীকে তীব্র যানজটের মুখে পড়তে হচ্ছে।


ঢাকার মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম এই বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়ে বলছিলেন, “সমাজে স্বল্পসংখ্যক একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে টাকা-পয়সা বেশি চলে এসেছে। দেখা যায়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা আছে তিনজন। যাদের প্রত্যেকের রয়েছে একটি করে গাড়ি। অথচ একটু সচেতন হলেই এই তিনটি গাড়ির জায়গায় একটি গাড়ি দিয়েও নিত্যপ্রয়োজন মেটানো সম্ভব।”


গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নামবিও’ প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০২১’ এর তথ্য বলছে, যানজটের দিক দিয়ে ঢাকা বর্তমানে নবম স্থানে রয়েছে। গেল বছর দশম স্থানে থাকলেও এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে প্রথম স্থানে ছিল এই মেগাসিটি। 


বাংলাদেশের বেসরকারি স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ সরজমিনে একটি জরিপ করে দেখেছে,  ৩টি ব্যক্তিগত গাড়ি ১২ জন ব্যক্তি নিয়ে যে স্থান দখল করে ঠিক সেই স্থানে ৩৬ জন থেকে ৪০ জন যাত্রী ধারণ ক্ষমতার একটি বাস স্থান নিতে পারে।


এজন্য ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে দৈনন্দিন কাজে নগরবাসীকে গণপরিবহনে উৎসাহিত করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।


মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলছেন, “মানুষ ছোট ছোট প্রয়োজন মেটানোর জন্য হলেও ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বের হয়। দেখা গেল, আধা কিলোমিটার এলাকায় যাবে, সেখানে গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে। এই প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে। “


পরিবেশ দূষণে ব্যক্তিগত গাড়ি


যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ২০১৮ সালে ঢাকা শহরকে বাসের অযোগ্য বলে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পেছনে যে দু’টি অন্যতম কারণ কাজ করেছে সেগুলো হলো যানজট এবং দূষণ।


যানজটের কথা আগেই বলেছি। পরিবেশ দূষণের অন্যতম বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত গাড়ির কালো ধোঁয়া।


বাংলাদেশের বেসরকারি স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলছেন, ” রাজধানীতে ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়িসহ অন্যান্য যানবাহনের একটি বিরাট অংশ বায়ু দূষণ করছে। নির্গত করছে কার্বন মনো অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং ওজোন গ্যাস।”


ঢাকার দীর্ঘ যানজটে গণপরিবহন ও এসি নেই এমন গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ রাখা সম্ভব হলেও এসি আছে এমন গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ রাখা হয় না। এমন গাড়ির তালিকায় অধিকাংশই ব্যক্তিগত গাড়ি। এতে করে কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে।  নামবিও গবেষণা সূচক বলছে, কার্বন নিঃসরণে এই বছর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অবস্থান ১০৭তম। গেল বছর ছিল ১১৪ তম। তবে করোনাট আগে ২০১৯ সালে ভয়াবহ অবস্থান ছিল শহরটির, সে বছর অবস্থান ছিল ৩২। 




সচেতনতায় দিবস


১৯৬২ সাল থেকে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরের সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে শুধুমাত্র পথচারীদের জন্য উন্মূক্ত করা হয়। এরপর ইউরোপে এই ধারণাটির প্রসার ঘটতে শুরু করে।

সত্তরের দশকে জ্বালানী তেলের সংকটের সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানোয় উৎসাহিত হতে দেখা গিয়েছিল বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের জনগণকে। এরপর নব্বইয়ের দশকে ইউরোপের দেশগুলোতে এমন একটি দিবসের ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠে। পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে এই দিবসটি প্রথম পালনের উদ্যোগ নেয়া হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে, ১৯৯৯ সালে। পাইলট প্রজেক্টটির সফল আয়োজন দিবসটির আনুষ্ঠানিক উদযাপনে উৎসাহিত করে আয়োজকদের।পরের বছর সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিবছর ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা হবে।  ২০০১ সালের  বিশ্বের ৩৩টি দেশের প্রায় ১০০০ শহরে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালন করা হয়। এখন প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ৪০০০ শহরে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।


বাংলাদেশে আয়োজন


২০০৬ সাল থেকে বেসরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালন শুরু হয়। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মত ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এর সমন্বয়ে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে ঢাকা শহরের মানিক মিয়া এভিনিউ এ বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালন করা হয়। ২০১৭ সালে সরকারি-বেসরকারি ৪৯টি সংগঠন এবং ২০১৮ সালে সরকারি-বেসরকারি ৫১টি সংগঠন এবং ২০১৯ সালে সরকারি-বেসরকারি ৫৯টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস উদযপান করা হয়। বাংলাদেশে দিবসটির মূল আয়োজন করে থাকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।


ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসে মানুষকে গাড়ি বাদ দিয়ে হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং শহরে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে গাড়িমুক্ত দিবস পালন করা হয়।"



Tags: বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়ি মুক্ত দিবস, world car free day, ব্যক্তিগত গাড়িতে যানজট, ঢাকায় যানজট, ব্যক্তিগত গাড়ি,বাংলা কার, tma, tma bd,