TmA ডেস্ক
প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে দেখা হয় বিভাগকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি নজর দেওয়া হয় তাহলে আমরা দেখতে পাই, জাতীয় স্তরে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনস্থ পরিদপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থা আছে। এর পরের স্তরগুলো হচ্ছে বিভাগ, জেলা আর উপজেলা। অবস্থাদৃষ্টিতে জনগণের কাছে প্রশাসনিক নানান কাজ কিংবা সুবিধাদির জন্য জেলা এবং উপজেলার গুরুত্বই বেশি থাকে। উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা, ভূমি প্রশাসন আর বিভিন্ন ধরনের নাগরিক পরিষেবা দান জেলা-উপজেলাতেই হয়ে থাকে। তাহলে বিভাগের কাজ কী? দেশের দুটি জেলাকে বিভাগ করার দাবি নিয়েই বা এত তোলপাড় কেন?
বিভাগ মূলত একটি তদারকি স্তর। সাধারণ প্রশাসনে বিভাগীয় কমিশনার তদারকির কাজ ছাড়াও ভূমি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কিছু আপিল নিষ্পত্তি করে থাকেন। তবে তদারকি স্তর হিসেবে বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজ পরিদর্শন ও পর্যালোচনা করে অধিকতর উন্নতি বিধানের জন্য নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। মূল্যায়ন করেন তাঁদের কার্যক্রম। তাঁরা জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের সঙ্গে ক্ষেত্রবিশেষে সংযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। তবে প্রকৃত অর্থে সীমিত কিছু ক্ষেত্র ছাড়া জাতীয় পর্যায় থেকে জেলা পর্যায়ের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হয়। অবহিত রাখা হয় বিভাগীয় স্তরকে। একইভাবে অনেক ক্ষেত্রে জেলা থেকেও সরাসরি জাতীয় পর্যায়ে যোগাযোগের বিধান রয়েছে। আর প্রকৃতপক্ষে মূল কাজ জেলা ও উপজেলায় হয় বলে এ ধরনের যোগাযোগই স্বাভাবিক।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলছেন, "তদারকি স্তর হিসেবে বিভাগকে উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে বিভাগীয় পর্যায়ের সঙ্গে জনগণের সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা খুবই কম।"
কুমিল্লা বিভাগ করার দাবির আদ্যোপান্ত
ব্রিটিশ-ভারতের প্রাচীনতম শহর বলা হয় গোমতী নদীর তীর ঘেঁষে থাকা কুমিল্লাকে। আগে এর নাম ছিল ত্রিপুরা জেলা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে জনসভা হয়। ১৯৬০ সালে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের ফলে কুমিল্লা পৃথক জেলার মর্যাদা পায়। ১৯৮৬ সালে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তৎকালীন কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান ও বর্তমানে কুমিল্লা সদর আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার।
১৯৮৯ সালে বৃহত্তর কুমিল্লার কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং বৃহত্তর নোয়াখালীর নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরসহ ছয়টি জেলা নিয়ে কুমিল্লা বিভাগ প্রতিষ্ঠার দাবি শুরু হয়। তবে অনেক ঐতিহাসিকই দাবি করেন, কুমিল্লাকে বিভাগ প্রতিষ্ঠার দাবি শুরু হয় ষাটের দশকে।
১৯৮৯ সাল থেকে কুমিল্লা বিভাগের দাবি জানিয়ে আসছেন কুমিল্লার প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোখলেছুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলছিলেন , ‘১৯৬১ সালে লাকসামে প্রথমে কুমিল্লা বিভাগের দাবি ওঠে। ১৯৮৯ সাল থেকে আমরা সাংগঠনিক দাবি করে আসছি। "
শুরুর দিকে কুমিল্লা গণফোরাম নামের একটি সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে বিভাগ ঘোষণার দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। পরে সংগঠনের নাম হয় কুমিল্লা গণদাবি পরিষদ। ১৯৯৪ সালে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন পরিষদ গঠন করা হয়।
অ্যাডভোকেট মোখলেছুর বলছিলেন, ‘ব্রিটিশ আমলেও কুমিল্লাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। ব্রিটিশরা এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে কুমিল্লাকে বিবেচনা করতেন। যার কারণে এখানে তারা বিমানবন্দর, সেনানিবাসসহ বহু প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। ১৮৯০ সালে কুমিল্লা মিউনিসিপ্যালিটি (পৌরসভা) স্থাপিত হয়; যা এখন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন। ১৮৯০ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে মাত্র চারটি পৌরসভা স্থাপন করা হয়। অন্যগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ।’
বর্তমানে বৃহত্তর কুমিল্লা ও বৃহত্তর নোয়াখালীর ছয়টি জেলায় প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যা রয়েছে। ওই ছয় জেলার আয়তন প্রায় ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার। যা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত সিলেট, বরিশাল ও রংপুর বিভাগের চেয়ে জনসংখ্যা ও আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ।
২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ময়মনসিংহকে অষ্টম প্রশাসনিক বিভাগ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর কুমিল্লা বিভাগ করার বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে উত্থাপন করা হয়।
ওই বছরের ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগকে ভেঙে কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে পৃথক বিভাগ করা যায় কি না, এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে নির্দেশনা দেন। তারপর এ নিয়ে মাঠপর্যায়ে জরিপ করা হয়। একই সঙ্গে দুটি জায়গাও বিভাগীয় কার্যালয় করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পৌঁছানো হয়।
ফেসবুক প্রোটেক্ট চালু না করলে বন্ধ হবে একাউন্ট?
২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রস্তাবিত কুমিল্লা বিভাগের নাম ময়নামতি বিভাগ হবে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
একনেকের ওই সভায় আরও বলা হয়, এখন থেকে আর কোনো জেলার নামে বিভাগের নামকরণ হবে না। ওই ঘোষণা দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধনও হয়।
২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর কুমিল্লায় এক অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, "কুমিল্লার নামেই বিভাগের নামকরণ করা হবে। কুমিল্লা বিভাগের প্ল্যান হয়ে গেছে। কিছু কারণে বিভাগ ঘোষণা করতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কথা দিলাম কুমিল্লার নামেই কুমিল্লা বিভাগ হবে।"
নোয়াখালীর জনগণও বেশ কয়েক বছর ধরে নোয়াখালীকে বিভাগ করার দাবি জানিয়ে আসছে। একই অনুষ্ঠানে নোয়াখালীর সাথে বিভাগ নিয়ে টানাপোড়েনের কথাও উল্লেখ করেন অ্যাডভোকেট আনিসুল। বলেন, " যাদের সঙ্গে নিতে চেয়েছিলাম তারা আসবে না। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং চাঁদপুর থাকছে কুমিল্লার সঙ্গে। "
বিভাগ করতে হলে অন্তত চারটি জেলা থাকতে হয়। যেহেতু বৃহত্তর নোয়াখালী ( নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী) থাকছে না কুমিল্লার সাথে সেহেতু বাকি তিনটি জেলা (কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) নিয়ে বিভাগ করা সম্ভব নয়। তাই সে সময় গুঞ্জন উঠেছিল, কুমিল্লা জেলাকে ভেঙ্গে আরেকটি জেলা হতে পারে। সেটি হতে পারে লাকসাম বা দাউদকান্দি জেলা।
দাবির পক্ষে যৌক্তিকতা আছে?
কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের জন্য ৬১ বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন কুমিল্লাবাসী। এখানে বিভাগ পরিচালনার প্রয়োজনীয় কার্যালয়ও রয়েছে। শুধু বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশের ডিআইজি রেঞ্জের কার্যালয় স্থাপন করলেই বিভাগের কার্যক্রম শুরু করা যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনেরা।
কুমিল্লায় জাতীয় ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় এবং কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক অর্ধশতাধিক সরকারি-বেসরকারি দফতর রয়েছে। কুমিল্লাকে বিভাগ করলে এ দফতরগুলোর মধ্যে অনেকটিই নতুন করে স্থাপন করতে হবে না। এগুলোকেই বিভাগীয় দফতর হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। ইতিমধ্যে বিভাগের অন্যতম অনুষঙ্গ কুমিল্লায় সিটি করপোরেশন স্থাপিত হয়েছে।
ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবির বলেন, ‘যে নামেই হোক কুমিল্লা বিভাগ সময়ের দাবি। কুমিল্লাকে বিভাগ করলে অনেক সরকারি দফতর নতুন করে স্থাপন করতে হবে না। এগুলোকেই বিভাগীয় দফতর হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও পুলিশের ডিআইজি রেঞ্জের কার্যালয় স্থাপন করলেই বিভাগের কার্যক্রম শুরু করা যাবে।’
৬১ বছরের অপেক্ষায় আর কতদিন যোগ হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

