গ্রেট ডিপ্রেশনঃ পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দা | Great Depression

Written by : Tanvir Mahatab Abir




একটি ব্যক্তিগত মোটর গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটি বিক্রি হবে, গাড়ির সামনে রাখা একটি প্ল্যাকার্ডে দামও লিখে দেওয়া হয়েছে, ১০০ ডলার। গাড়িটি ঘিরে উৎসক জনতার ভীড়। কিন্তু কেউই তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না গাড়িটি কিনতে। 


সময়টা ১৯২৯ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে বড় রকমের ধস নামে সে সময়। নিজের বিনিয়োগকৃত সব অর্থ হারিয়ে এক ব্যক্তি এভাবেই তার গাড়িটি বিক্রির চেষ্টা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বিক্রি করতে পেরেছিলেন কি না তা অবশ্য জানা যায় নি। 


গ্রেট ডিপ্রেশন। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দার নাম। 

কিভাবে হলো এই মন্দা? শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল এর পরিণতি জানতে চেষ্টা করবো এই ভিডিওতে।  


১৯২০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি ঘটতে শুরু করে হটাত করেই। 


দেশটির বৃহৎ এবং বাণিজ্যিক শহরগুলোয় গড়ে উঠতে শুরু করে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং কলকারখানা। এর সাথে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, কর্পোরেট অফিস এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানেরও ব্যাপক উন্নতি ও প্রসার বেশ লক্ষণীয় ছিল সে সময়। একই সময়ে মার্কিন প্রশাসনও বিভিন্ন খাতে উন্নয়নের কাজ শুরু করে। ফলে সব মিলিয়ে লক্ষ লক্ষ নাগরিকের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং তারা উল্লেখযোগ্য হারে আয়ও করতে শুরু করে।




 পরের দশ বছর জনগণের সম্পদের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ইতিহাসে এই সময়টি রোরিং টুয়েন্টি নামে পরিচিত৷ সে সময় আমেরিকানদের সম্পদ বাড়ায় তারা তাদের সব ধরণের শখ পূরণে উদ্যোগী হয়। তবে বহু কেনাকাটার মধ্যে আমেরিকানদের সবথেকে বেশি ক্রয়ের তালিকায় শীর্ষে ছিল অটোমোবাইল। প্রাইভেট কারের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকায় আমেরকিানদেরও কেনার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল গাড়ি। ১৯২৯ সালে এসে প্রতি পাঁচজন আমেরিকান নাগরিকের মধ্যে একজনের একটি গাড়ি থাকতো রাস্তায়। গাড়ি থাকায় যে যেখানে খুশি সেখানে যাওয়ার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে উঠতে শুরু করে। ঘরে ঘরে নাচ গানের আসরও বসতো হরহামেশাই। ১৯২০ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ০.৫ শতাংশের বেশি এলকোহল আছে এমন পানীয় বিক্রির সব বার, স্যালোন বা এ জাতীয় দোকান বন্ধ করে দেয়, এবং এইসব পানীয় বিক্রি করা আইনত নিষিদ্ধ করে। কিন্তু বিক্রি কি আর থেমে থাকে? এসব পানীয়র বাজারজাতকারীরা গোপনে এসব পানীয় বিক্রি করতো। লস এঞ্জেলসে একবার ফেডারেল এজেন্টরা কাঠ বোঝাই একটি গাড়ি জব্দ করে। গাড়িটি সার্চ করতে গিয়ে তারা একটি ট্র্যাপ ডোর খুঁজে পায় যার ভেতরে পাওয়া যায় ৭০ কেইস দামী প্রাইম স্কচ। এভাবেই গোপনে গোপনে চলতো এসব পানীয়ের ব্যবসা। আমেরিকানরা এসব কিনে অভিনব সব কায়দায় ঘরে লুকিয়ে রাখতো। রোরিং টুয়েন্টির সময়ে এসব ব্যাপার বেশ ভাবনায় ফেলে আমেরিকান প্রশাসনকে।  


আমেরিকানদের জীবনমানের ব্যাপক এই পরিবর্তন আরও বড় স্বপ্ন দেখাতে তাদের উৎসাহিত করে তুলে , আকাঙ্খা বেড়ে যায় আরও বেশি অর্থ উপার্জনে। এজন্য তারা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। সে সময় মিলিয়নিয়ার থেকে শুরু করে রান্নাঘরের বাবুর্চি, এমনকি বাড়ির দারোয়ান; শেয়ারবাজারে টাকা ঢালায় কেউই পিছিয়ে থাকে নি। নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে বিনিয়োগকারীদরে বিশাল লাইন ছিল প্রতিদিনের ঘটনা। শেয়ার বাজারও ফুলে ফেঁপে উঠছিলো দিনকে দিন৷ এই ফুলে ফেঁপে উঠা ১৯২৯ সালের আগস্টে এসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। 


মুদ্রার অপর পিঠ দেখতে শুরু করে মার্কিনীরা৷ উৎপাদন ব্যবস্হায় বিপর্যয় দেখা দিতে শুরু করে। বাড়তে থাকে বেকারত্বের হাহাকার, যার ফলে শেয়ারের দাম তাদের আসল মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়। সেই সময়ে মজুরি কম ছিল, ভোক্তার দেনাও বাড়ছিলো, খরার কারণে এবং খাদ্যের দাম কমে যাওয়ায় কৃষিক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব লক্ষণীয় ছিল। জনগণ ব্যবসায়ের নামে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেগুলো শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা শুরু করায় ব্যাংকগুলো ঋণের বোঝা নিয়ে হিমশিম খেতে শুরু করে। 


এতসব কিছুর ফলাফলও ছিল ভয়াবহ। সে বছরের অক্টোবরে অসাধু কিছু বিনিয়োগকারীদের প্ররোচনায় একদল ভীতু বিনিয়োগকারী নিজেদের সব শেয়ার বিক্রি করে দিতে শুরু করে। এমন করে ২৪ অক্টোবর একদিনেই বিক্রি হয়ে যায় ১২.৯ মিলিয়ন শেয়ার। বৃহস্পতিবারের সেই দিনটিকে ইতিহাসে black Thursday বলা হয়ে থাকে। একইভাবে এর পাঁচদিন পর, ২৯ অক্টোবর বিক্রি হয় ১৬ মিলিয়ন শেয়ার। সেইদিনটি পরিচিত Black Tuesday নামে। যারা চারদিন আগে শেয়ারগুলো কিনেছিল তাদের বেশিরভাগই বিপদ বুঝতে পেরে ক্রয় করা শেয়ারগুলো বিক্রি করতে থাকে সেইদিন। 


শুরু হয় শেয়ারের দরপতন। কয়েক মিলিয়ন শেয়ার মূল্যহীন হয়ে পড়তে সময় নেয় নি এবং যে বিনিয়োগকারীরা ধার করে সম্পত্তি বন্ধক রেখে মোটা দাগে শেয়ার কিনেছিল তারা সব হারিয়ে পথে বসে যায়। 


আমেরিকানদের জীবনযাপনে বড় রকমের ধাক্কা হয়ে এসেছিল শেয়ারবাজারের এই সংকট। শিল্পকারখানার উৎপাদন হ্রাস পাওয়া শুরু করেছিল, কোথাও কোথাও বন্ধও হয়ে গিয়েছিল কারখানা। কর্মী ছাটাই ছিল সাধারণ এক ঘটনা। এই অবস্হায় ১৯৩০ সালে দেশজুড়ে চার মিলিয়ন মানুষ বেকার হয়ে পড়ে, পরের বছর এই সংখ্যা ছয় মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেক মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়ে দিশেহারা হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে৷ কেউ কেউ পেটের দায়ে নিজের সন্তান পর্যন্ত বিক্রি করে দেয়। ঋণের বোঝা নিয়ে দেউলিয়া হয়ে ১৯৩৩ সাল নাগাদ হাজার হাজার ব্যাংকের শাখা বন্ধ হয়ে যায়। 


যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক মহামন্দার সময়ে দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন রিপাবলিকান নেতা হার্বার্ট হুভার। তিনি ও তার সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও অসহায় মার্কিনীদের ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে আসে নি মার্কিন প্রশাসন। রিপাবলিকান হিসেবে হুভারের বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ করা সমীচীন নয়। সেই সাথে চাকরিচ্যুত কিংবা নিঃস্ব হওয়া লোকদের ত্রাণ সরবরাহেও সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।  




মার্কিনীদের বিষন্নতার দিনগুলো অতিবাহিত হওয়ার মধ্যেই ১৯৩৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জয়ী হন ডেমোক্রেটিক প্রার্থী ফ্রান্কলিন ডি রুজভেল্ট। দায়িত্ব নিয়েই রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্ব দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সচেষ্ট হন। এরই অংশ হিসেবে রুজভেল্ট প্রথমেই চারদিনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ দেশের সকল ব্যাংকের শাখা বন্ধ ঘোষণা করেন যাতে করে এই সময়ের মধ্যে কংগ্রেসে নতুন আইন পাশ করিয়ে শিল্প, কৃষি ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে গতিশীল করার উদ্যোগ নিতে পারা যায়। জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য বেছে নেন রেডিও মাধ্যমকে। জনগণের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে ধারাবাহিকভাবে রেডিওতে কথা বলা শুরু করেন রুজভেল্ট। দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম ১০০ দিনে তাঁর প্রশাসন কৃষির ফলন ও কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধি করায় সচেষ্ট হন এবং বেকারত্ব দূরীকরণেও বেশ সচেষ্ট ভূমিকা পালন করে। 


বেশ কিছু উন্নয়ন ও নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়ে

১৯৩৫ সাল থেকে পরবর্তী নয় বছরে প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন মার্কিন নাগরিকের স্থায়ীভাবে নিয়োগের সুযোগ করে দেয় মার্কিন সরকার। কনগ্রেসে ১৯৩৫ সালে সোশ্যাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট নামে একটি আইন পাশ হয়। এর ফলে মার্কিনীরা বেকারত্ব, বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে অক্ষমতার ভাতা পাওয়া শুরু করেন। এমন করে নানা উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের মন্দা কবলিত অর্থনীতি৷ ১৯৩৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি গড়ে ৯ শতাংশ বেড়ে যায়৷ 

তবু মহামন্দা কাটিয়ে উঠা সহজ ছিল না মার্কিনীদের জন্য৷ ১৯৩৭ সালে ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখার ক্ষেত্রে নতুন কিছু নিয়ম চালুর সিদ্ধান্ত নেয়ার পর 

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে আবার মন্দাভাব দেখা দেয়। যদিও পরের বছরই আবার অর্থনীতির চাকা উন্নতির পথেই ঘুরতে শুরু করে। কিন্তু বারবার এই মন্দার প্রভাব দীর্ঘায়িত করে তুলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাফল্যকে। 


১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে আঘাত হানে। ৬টি বিমানবাহী জাহাজ থেকে ৩৫৩টি জাপানি যুদ্ধ বিমান, বোমারু বিমান এবং টর্পেডো বিমান নৌ-ঘাঁটিটিতে একযোগে আক্রমণ করে বসে। চারটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সাথে সাথেই ডুবে যায়। এছাড়াও আরও চারটি যুদ্ধজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাপানের এ বিমান আক্রমণে ১৮৮টি মার্কিন বিমান ধ্বংস হয়। নিহত হয় ২,৪০২ জন এবং আহত হয় বারোশ'র বেশি মানুষ। 


আক্রমণের এই ভয়াবহতায় চুপ থাকে নি মার্কিন প্রশাসন। সিদ্ধান্ত নেয় পাল্টা আঘাতের। বেজে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা। যুক্তরাষ্ট্রের যেসব কারখানায় গ্রেট ডিপ্রেশনের প্রভাবে আংশিক উৎপাদন হচ্ছিলো ১৯৪২ সালে সেসব কারখানা সর্বোচ্চ উৎপাদনে ফিরতে শুরু করে। কমতে থাকে বেকারত্বের সংখ্যা। শেষ হয়ে আসে গ্রেট ডিপ্রেশনের দিন। যুক্তরাষ্ট্র মনোযোগী হতে শুরু করে বিশ্বযুদ্ধের মহারণে। 



References 

1. History.com


2. History.com 2