সাইমন ড্রিং উঠেছিলেন শাহবাগের তখনকার হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে। ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হোটেলেই লুকিয়ে ছিলেন। ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ উঠে গেলে হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় ছোট্ট একটি মোটরভ্যানে করে ঘুরে দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। তারপর লেখেন ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামের বিখ্যাত প্রতিবেদন। ঢাকায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো প্রথম দফার গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ চিত্র উঠে আসে ওই প্রতিবেদনে। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৩০ মার্চ সেটা ছাপা হয়। এমন করেই বিদেশী সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের সাহসী ভূমিকা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে।
বিদেশী গণমাধ্যমের কখন থেকে আলোচনায়?
১৯৭১-এর মার্চের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সক্রিয়ভাবে রুখে দাঁড়াতে শুরু করে পাকিস্তানের নিষ্ঠুর সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন।
বঙ্গবন্ধুর ৩২নং ধানমন্ডির বাসভবন ছিল সে সময় আন্দোলনের নেতাদের বৈঠকের স্থান। প্রতিদিন নেতারা বৈঠক করে পরের দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করতেন। কিন্তু এই কর্মসূচিগুলোর প্রচার নিয়ে সন্দিহান ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। টেলিভিশন না থাকায় এবং রেডিওর স্বল্পতাজনিত কারণে ব্যাপক প্রচার প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপারে পরিণত হয়। ফলে আন্দোলনরত আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দের কাছে কর্মসূচিগুলো পৌঁছানো দুরূহ হয়ে পড়ে। এই অভাবটা মিটিয়েছিলেন বিদেশি সাংবাদিকরা। ঝাঁকে ঝাঁকে বিপুল সংখ্যক বিদেশি সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের সাংবাদিক তখন ঢাকায়।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো বুঝতে পারে, একটা কিছু হতে চলেছে। তাই তারা তাদের সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তানে পাঠাতে শুরু করে। শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থানরত এদের মধ্যে ছিলেন আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপানের প্রায় ৩৭ জন সাংবাদিক। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর পূর্বমুহূর্তে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বিদেশি সব সাংবাদিককে হোটেলে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।এসব সম্পর্কে কোনো খবর যাতে কোনো পত্রিকা প্রকাশ না করে বা রেডিও প্রচার না করে তেমন নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসাথে বিদেশি সাংবাদিকদের পূর্ব বাংলা ছেড়ে ফিরে যেতে নির্দেশ দেয়।
কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না বিদেশী গণমাধ্যম কর্মীরা। শুরু হয় বিদেশি সাংবাদিকদের ব্যাপক তৎপরতা।
বেশ কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হোটেলের ছাদে উঠে ঢাকার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন ও কেউবা রাতের আঁধারে খবর সংগ্রহে বেরিয়ে পড়েন। ২৫শে মার্চ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের নৃশংস রূপ দেখতে শুরু করে বাঙালীরা। তারা সেসব খবর সংগ্রহ করে ছবিসহ নিউজ বিদেশগামী প্লেনের বিভিন্ন যাত্রীর মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের পত্রিকায় পাঠিয়ে দেন।
বিদেশি সাংবাদিকরা গোপনে ট্যাংক বাহিনী ঢাকা শহরে যে গণহত্যা চালিয়ছে তার ছবি নিজ নিজ ক্যামেরায় ধারণ করে ঘটনার বর্ণনাসহ বিশেষ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে গোপনে পাচার করতে থাকে। মুহূর্তে বিবিসিসহ সব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিশেষ খবর হিসেবে গণহত্যার বিবরণসমূহ প্রচার করতে থাকে। ঢাকা শহরকে তারা যে মৃতের শহরে পরিণত করেছে তাও গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়।
পাতায় পাতায় যুদ্ধের ভয়াবহতা
১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ লন্ডনের ‘দ্য অবজারভার’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। লেখা হয়, "রাশিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে পারে। মস্কো উপলব্ধি করতে পেরেছে, পরাশক্তিগুলো যদি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, তবে পাকিস্তানের গণহত্যা বন্ধ হতে পারে। " এর দিন দুয়েক পর লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফে সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, "পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঠান্ডা মাথায় ২৪ ঘণ্টা অবিরাম গোলাবর্ষণ করে প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করে। পুলিশ সদর দপ্তর, ছাত্রাবাস, দোকানপাটে নির্বিচারে হত্যা ও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর দেয়। এতে তারা আরও লেখে, বাঙালি জনগণ যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা গত সপ্তাহে বেদনাদায়ক এক গণহত্যার মাধ্যমে শেষ হয়ে গেছে। এই দুঃস্বপ্ন ভুলতে তাদের কয়েক প্রজন্ম লেগে যাবে।" টাইম সাময়িকী ১২ এপ্রিল এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে তারা উল্লেখ করে, "পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সম্ভবত কিছু সময়ের জন্য ঢাকাসহ পূর্বাংশের শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু অনির্দিষ্টকাল ৫৪ হাজার বর্গমাইলের বিশাল অঞ্চল বাগে রাখতে পারবে না। "
একইদিন নিউজউইক ‘একটি আদর্শের মৃত্যু’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় একদল লিকলিকে রোগা হতদরিদ্র বাঙালি কীভাবে সড়কি, বল্লম আর বাঁশের লাঠি দিয়ে যশোরে ১ হাজার পাকিস্তানি সুসজ্জিত বাহিনীকে আটকে রেখেছিল, তার বর্ণনা।
লন্ডনের দ্য অবজারভার ১৮ এপ্রিল ‘স্বপ্নভঙ্গের পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগে, ছাত্র-শিক্ষক হত্যার খবর প্রকাশ করে।
১৩ জুন দ্য সানডে টাইমস ‘গণহত্যা’ নামে ১৪ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটিতে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস মার্চের শেষে পশ্চিম পাকিস্তানিদের পরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার বেসামরিক লোককে হত্যা, ধর্ষণ, ৫০ লাখের বেশি মানুষের শরণার্থী হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া, গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর জ্বালিয়ে দেওয়া ও লুটপাটের ঘটনার বিশদ বিবরণ দেন।
আত্মসমর্পনের পর ২০ ডিসেম্বর টাইম সাময়িকী ‘যুদ্ধের ভেতর দিয়ে একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপে। এতে তারা লেখে, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বাংলা’। পদ্মা আর ব্রহ্মপুত্রের মতো বিশাল নদীর তীর, সবুজ প্রান্তর আর অসংখ্য গ্রামের অগণন চত্বর থেকে উঠছে বাংলার এই বিজয় ধ্বনি।
বিশ্বময় খবর ছড়ানোয় যারা ছিলেন অগ্রভাগে
মুক্তিযুদ্ধের অবরুদ্ধ সময়ে জীবন বাজি রেখে অনেক বিদেশি সাংবাদিক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করেছিলেন, প্রকাশ করেছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সেসব প্রতিবেদন, আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ কেবল বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেনি, সময়ের পরিক্রমায় তা হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল।
১৯৭১ সালে লন্ডনের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিবেদক সাইমন ড্রিং ৬ মার্চ ঢাকায় এসে পরের দিন ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ প্রত্যক্ষ করেন।পূর্ব পাকিস্তানের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি নিয়ে একের পর এক রিপোর্ট পাঠাতে থাকেন টেলিগ্রাফ পত্রিকায়।ঢাকায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো প্রথম দফার গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ চিত্র উঠে আসে লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৩০ মার্চ ছাপা হওয়া তার প্রতিবেদনে।
ওই দিনই সাইমনকে লন্ডন চলে যেতে হয়। এরপর কলকাতায় আসেন নভেম্বরে; সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দিতেন টেলিগ্রাফ পত্রিকায়।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ছিলেন করাচির মর্নিং নিউজের সাংবাদিক ও ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান সংবাদদাতা।মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান সরকার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মাসকারেনহাসসহ আট জন সাংবাদিককে পূর্ব বাংলায় নিয়ে আসে। করাচি ফিরে তিনি ১৮ মে লন্ডনে হাজির হন সানডে টাইমসের দফতরে। সেখানে পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
সেই প্রতিবেদনে মাসকারেনহাস লেখেন, ‘পূর্ব বাংলার শ্যামল প্রান্তরজুড়ে আমি আমার প্রথম চাহনিতেই জমাট রক্তপুঞ্জের দাগ দেখতে পেয়েছিলাম। এই সংঘবদ্ধ নিপীড়নের শিকার কেবল হিন্দুরাই নয়, হাজার হাজার বাঙালি মুসলমানও এ নির্মমতার শিকার।' ১৩ জুন সানডে টাইমস দুই পৃষ্ঠাজুড়ে মাসকারেনহাসের প্রতিবেদনটি ছাপে। শিরোনাম ছিল এক শব্দের, ‘জেনোসাইড’।
একাত্তরে মার্ক টালি বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।
মার্ক টালি ২৫ মার্চের বর্বর হামলা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। পরে তাকে ঢাকা ছেড়ে যেতে হয়। তিনি সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও জেলাগুলো ঘুরে বাঙালির দুর্দশা ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির খবর পাঠাতে থাকেন দিল্লি থেকে। আবার লন্ডনে বসেও তিনি যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশ্লেষণ হাজির করতেন।
একাত্তরে মার্কিন সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ ছিলেন নিউইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশীয় সংবাদদাতা। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে ২৫ ও ২৬ মার্চ ঢাকায় ছিলেন তিনি। গণহত্যার খবর প্রচার করায় পাকিস্তানি সরকার তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে। এরপরও তিনি বারবার ফিরে এসেছেন সীমান্ত এলাকায়।২৮ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমসে ‘In Dacca, Troops use Artillery to halt revolt’ শিরোনামে শনবার্গের যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, তাতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে নিরীহ বাঙালির ওপর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বর্বরতার বর্ণনা করেন। তিনি এই সামরিক অভিযানকে আখ্যায়িত করেন ‘পাইকারি হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।
আরো পড়ুন :
১। জন্মদিন পালনে ইসলাম কী বলে?
২। ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে যা জানতেই হবে
৩। স্বপ্নে কী এমন ভয়ংকর শাস্তি দেখেছিলেন রাসূল (সা.)?