Written by : Tanvir Mahatab Abir
হিজরতের সময়ের ঘটনা। মদিনায় যাওয়ার পথে রাসূল (সা.) সঙ্গী আবু বকর (রা.)কে নিয়ে এক মহিলার তাঁবুতে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নেন। উম্মে মাবাদ খােযাইয়া নামের সেই মহিলা পথচারীদের সাধ্যমত পানাহার করাতেন সবসময়। কিন্তু রাসূল যখন তার তাঁবুতে যান তখন পানাহার করানোর মত তেমন কিছুই তার কাছে ছিল না। সে সময় উম্মে মাবাদের একটি বকরি বাড়ির পাশেই বাঁধা ছিল। দুর্বল সেই বকরির হাঁটার মত শক্তিও ছিল না। রাসূল (সা.) উম্মে মাবাদের অনুমতি নিয়ে সেই বকরিটির ওলানে হাত রাখলেন, আল্লাহর নাম নিলেন, করলেন দোয়া। বকরিটি সাথে সাথে পা প্রসারিত করে দাঁড়ালো, ওলান দুধে ভরে গেল। রাসূল (সা.) বড় একটি পাত্রে দুধ দোহন করলেন, উপস্থিত সকলে সেই দুধ খাওয়ার পর রাসূল (সা.) বকরির ওলান থেকে আবারও দুধ দোহন করলেন। সেই দুধ উম্মে মাবাদের হাতে দিয়ে ফের যাত্রা শুরু করলেন। এদিকে উম্মে মাবাদের স্বামী বাড়ি ফিরে এত দুধ দেখে তো অবাক। কোথায় পেল এত দুধ সে কথা জিজ্ঞেস করায় রাসূলের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তাঁর আকৃতি সম্পর্কিত একটি বর্ণনা দিয়েছিলেন উম্মে মাবাদ খোযাইয়া।
“চমকানাে রং, উজ্জ্বল চেহারা, সুন্দর গঠন, সটান সােজাও নয়, আবার ঝুঁকে পড়াও নয়, অসাধারণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি চিত্তাকর্ষক দৈহিক গঠন, সুরমারাঙা চোখ, লম্বা পলক, ঋজু কণ্ঠস্বর, লম্বা ঘাড়, সাদা কালাে চোখ, সূক্ষে এবং পরস্পর সম্পৃক্ত ভ্রূ, চমকানাে কালাে চুল,
চুপচাপ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, কথা বলার সময়ে আকর্ষণীয়, দূর থেকে দেখে মনে হয় সবার চেয়ে উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যপূর্ণ, কাছে থেকে দেখে মনে হয় তিনি সুমহান এবং প্রিয় সুন্দর, কথায় মিষ্টিতা, প্রকাশভঙ্গি সুস্পষ্ট, কথা খুব সংক্ষিপ্তও নয় আবার দীর্ঘায়িতও নয়, কথা বলার সময় মনে হয় যেন মুক্তো ঝরছে, মাঝারি উচ্চতাসম্পন্ন, বেঁটেও নয় লম্বাও নয় যে, দেখে খারাপ মনে হবে। ” ঠিক এমনই ছিল রাসূল সম্পর্কে উম্মে মাবাদের বর্ণনা।
প্রায় একই মত এসেছে হযরত আলী (রা.) এর এক বর্ণনাতেও। “তিনি অস্বাভাবিক লম্বা ছিলেন না, আবার বেঁটেও ছিলেন না। তিনি ছিলেন মাঝারি ধরনের গঠন বৈশিষ্টসম্পন্ন। তাঁর চুল কোকড়ানােও ছিলাে না, আবার খাড়া খাড়াও ছিলাে না, ছিলাে উভয়ের মাঝামাঝি ধরনের। তাঁর কপাল মাংসলও ছিলাে না আবার শুকনােও ছিলাে না; বরং উভয়ের মাঝামাঝি ধরনের ছিলাে। তাঁর কপাল ছিলাে প্রশস্ত, গায়ের রং ছিলাে গােলাপী গৌর-এর মিশ্ররূপ। বুকের ওপর নাডি থেকে হালকা চুলের রেখা, দেহের অন্য অংশ লােমশূন্য। হাত পা মাংসল। চলার সময় স্পন্দিত ভঙ্গিতে পা তুলতেন। তাঁকে হেটে যেতে দেখে মনে হতাে তিনি যেন ওপর থেকে নীচের দিকে যাচ্ছেন। কোন দিকে লক্ষ্য করলে পুরাে মনােযােগের সাথেই লক্ষ্য করতেন।”
আলী (রা.) এর বর্ণনায় রাসূলের উভয় কাঁধের মাঝখানে তাঁর মােহরে নবুয়ত থাকার কথা এসেছে। সহীহ মুসলমি শরীফের একটি হাদিসেওএসেছে সেটির বর্ণনা।
রাসূল (সা.) এর উভয় কাঁধের মাঝামাঝি জায়গায় ছিলাে মোহরে নবুয়ত। কবুতরের ডিমের মতাে দেখতে এই মােহরে নবুয়তের রং ছিলাে তাঁর দেহ বর্ণের মতাে।
তিরমিযী শরীফে হযরত আলী (রা.)-এর অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, রাসূলের মাথা ছিলাে বড়, জোড়ার হাড় ছিলাে ভারি, বুকের মাঝখানে লােমের হালকা রেখা ছিলাে। তিনি চলার সময়ে এমনভাবে চলতেন, তখন মনে হতাে কেউ যেন উঁচু থেকে নীচুতে অবতরণ করছে।
হযরত জাবের ইবনে ছামুরা (রা.) এর বরাতে সহীহ মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) এর পেশী ছিলাে চওড়া, চোখ ছিলাে লালচে, পায়ের গােড়ালী ছিলাে সরু ধরনের।
রাসূলের চুল সাদা ছিল কি না এমন প্রশ্নে বেশ কয়েকজনের বর্ণনাই পাওয়া যায়।
হযরত আনাস ইবনে মালেক ,বলেন “ওফাতের সময় পর্যন্ত তাঁর মাথা এবং চেহারার বিশটি চুলও সাদা হয়নি। শুধু কানের কয়েকটি লােম সাদা হয়েছিলাে, এছাড়া মাথার কয়েকটি চুলও সাদা হয়ে গিয়েছিলাে।”
হযরত আবু হােযায়ফা এক বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, “আমি রাসূল (সা.) এর নীচের ঠোট
সংলগ্ন দাড়ি সাদা দেখেছি ।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বাছার (রা.) ও একই কথা বলেছেন।
সহীহ বুখারীর এক বর্ণনায় এসেছে রাসূল (সা.) প্রথমে আহলে কেতাবদের মতাে চুল আঁচড়াতে পছন্দ করতেন। একারণে আঁচড়ালে
সিঁথি করতেন না, কিন্তু পরবর্তীতে সিথি করতেন।
হযরত জাবের ইবনে ছামুরা (রা.) ,বলেন এক চাদনী রাতে আমি রাসূল (সা.)কে দেখেছিলাম। সেই সময় তাঁর পরিধানে ছিলাে লাল পােশাক। আমি একবার রাসূলের প্রতি এবং একবার চাঁদের প্রতি তাকাচ্ছিলাম। অবশেষে আমি
এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, আমার নবী (সা.) চাদের চেয়েও অধিক সুন্দর।
হযরত কা’ব ইবনে মালেক (রা.) বলেন, রাসূল যখন খুশী হতেন, তখন তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠতাে। দেখে মনে হতাে যেন, এক টুকরাে চাঁদ।
হযরত জাবের ইবনে ছামুরা ,বলেন নবীজি যখন হাসতেন, মৃদু হাসতেন, তাঁর চোখ দেখে মনে হতাে যেন সুরমা লাগানাে, অথচ সুরমা লাগানাে ছিলাে না।
মেশকাত শরীফের এক বর্ননায়বলা হয়েছে,
তিনি যখন ক্রোধান্বিত হতেন, তখন তাঁর চেহারা লাল হয়ে যেতাে, মনে হতাে উভয়
কপালে আঙ্গুরের দানা যেন নিংড়ে দেয়া হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলের সামনের দুটি দাঁত পৃথক পৃথক ছিলাে। তাঁর কথা বলার সময় উভয় দাঁতের মধ্য থেকে
আলােকআভা বিচ্ছুরিত হতাে।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, কিশাের বয়স্ক হযরত জাবের ইবনে ছামুরা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) আমার কপালে হাত রেখেছিলেন, এতে আমি এমন শীতলতা ও সুবাস অনুভব করলাম যে, মনে হলাে, তিনি তাঁর পবিত্র হাত আত্তারের আতর দান থেকে বের করেছেন।
হযরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) এর ঘাম ছিলাে মুক্তোর মতাে। এই ঘামেই সবচেয়ে উত্তম খুশবু ছিল বলে হযরত উম্মে সুলাইম (রা.) এর এক বর্ণনায় এসেছে।
হযরত জাবের (রা.) বলেন, নবীজি কোন রাস্তা দিয়ে পথ চলার পর অন্য কেউ সেই পথে, সেই রাস্তা দিয়ে গেলে বুঝতে পারতাে যে, তিনি এ পথে দিয়ে গমন করেছিলেন।
এমনই ছিল রাসূলের দৈহিক সৌন্দর্য৷
আরো পড়ুন :
১। জন্মদিন পালনে ইসলাম কী বলে?
২। ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে যা জানতেই হবে
৩। স্বপ্নে কী এমন ভয়ংকর শাস্তি দেখেছিলেন রাসূল (সা.)?