বাংলায় ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় থেকে মুসলিম শাসনের শুরু। সেই থেকে অসংখ্য মুসলিম শাসক বাংলায় রাজত্ব করেছেন। আজকের পর্বে এমনই দশজন মুসলিম রাজার কথা জানার চেষ্টা করবো।
বখতিয়ার খিলজি
আফগানিস্তানের বাসিন্দা বখতিয়ার তুর্কি জাতির খিলজি সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার ও তার বাহিনী বিহার আক্রমণ করেন। তারা সে স্থান থেকে মূল্যবান সম্পদ লুন্ঠন করে প্রত্যাবর্তন করেন। পরের বছরই তিনি নদীয়া আক্রমণ করেন। বলা হয়ে থাকে, মাত্র ১৭ জন ঘোড়সওয়ার সৈন্য লক্ষ্মণ সেনের নগরে প্রবেশ করেছিল। রাজা লক্ষ্মণ সেন নৌপথে তার রাজধানী বিক্রমপুরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নামাজ-রোযার স্থায়ী সময় সূচী
ইতিমধ্যে বখতিয়ার খিলজির মূল বাহিনীও এসে পৌঁছায়৷ ফলে নদীয়া মুসলিমদের দখলে চলে আসে। তিনি ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে বিনা বাধায় গৌড় জয় করেন। বখতিয়ার খিলজি ১২০৬ সালে তিব্বত আক্রমণে বের হন। এই অভিযানে তিনি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হন এবং তার বিপুল সংখ্যক সেনা মারা যায়। বিমর্ষ হয়ে দেবকোটে বখতিয়ার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সে অবস্থায়ই তার মৃত্যু ঘটে।
কুতুবউদ্দিন আইবেক
কুতুবউদ্দিন আইবেক মধ্যযুগীয় ভারতের একজন তুর্কি শাসক ছিলেন। যিনি দিল্লির প্রথম সুলতান এবং দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা৷ তিনি সুলতান হিসেবে ১২০৬ থেকে ১২১০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র চার বছর শাসন কার্যে নিয়োজিত ছিলেন। আইবেকের রাজত্বকালে দিল্লির কুতুব মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। দানশীলতার জন্য তাকে লাখবখশ বলা হতো। ১২১০ সালে পোলো খেলার সময় ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে তার মৃত্যু হয়।
গিয়াসউদ্দিন বলবন
গিয়াসউদ্দিন বলবন ভারতের মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক যুগের সুলতান। তিনি ছিলেন দিল্লির নবম মামলুক সুলতান। যিনি প্রথম নাসিরুদ্দিন মাহমুদের উজির ছিলেন। নাসিরুদ্দিন নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাওয়ার পর বলবন মসনদে বসেন। বলবন ১২৬৬ থেকে ১২৮৬ সাল অবধি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত শাসন করেছেন। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ খান মঙ্গলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। আরেক পুত্র নাসিরউদ্দীন বুগরা খান বাংলার শাসক হিসেবে থাকাটা প্রথমদিকে পছন্দ করতেন না। তিনি সে সময় গর্ভনর পদটিকে বেছে নেন। তাই বলবন তার পৌত্র কায়খসরুকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। বলবনের মৃত্যুর পর অভিজাত ব্যক্তিরা কায়কোবাদকে সুলতান মনোনীত করেন।
গিয়াসউদ্দিন তুগলক
গিয়াসউদ্দিন তুঘলগলক ছিলেন দিল্লির তুঘলক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং এর প্রথম সুলতান। তিনি জীবনের প্রথমদিকে অনেক গরীব ছিলেন। এবং বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধে এক কুরাউনা ব্যাবসায়ীর অধীনে কাজ করতেন। তিনি তার শাসনামলে তুগলকাবাদ শহর নির্মাণ করেন। ১৩২৫ সাল পর্যন্তু তিনি দিল্লির বাদশাহ ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে মুহাম্মদ বিন তুগলক দিল্লির সিংহাসনে বসেন। অনেকেই মনে করেন গিয়াসউদ্দিন তুগলকের মৃত্যুর পেছনে মুহাম্মদ বিন তুগলকের হাত ছিল।
ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ
ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ জাতিতে তুর্কি এবং খুব সম্ভবত তুর্কিদের কারাউনা গোত্রীয় ছিলেন। তিনি দিল্লির তুগলক সুলতানের অধীনে সোনারগাঁয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খানের সিলাহদার বা অস্ত্রাগারের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। ১৩৩৭ সালে বাহরাম খানের মৃত্যুর পর ফখরুদ্দীন সোনারগাঁওয়ের শাসন ক্ষমতা করায়ত্ত করেন। নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার পর ১৩৩৮ সালে নিজেকে স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন। ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের রাজধানী ছিল সোনারগাঁ। তিনি ছিলেন স্বাধীন মুসলিম সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা। বহুগুণে বিকশিত বাংলার এই সুলতানের প্রধান কৃতিত্ব হলো জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রাচুর্য এবং পণ্যের সস্তা দর নিশ্চিত করে তিনি তার রাজ্যের জনগণের জন্য স্বাচ্ছন্দময় জীবনযাপনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
মুর্শিদ কুলি খাঁ
মুর্শিদ কুলি খান ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব। কৈশেরে দক্ষিণাপথের পথে-ঘাটে এক মুঠো খাদ্যের জন্য এদিক সেদিক ঘুড়ে বেড়াতেন। হঠাৎ তার উপর দৃষ্টি পরে ইস্পাহানের সওদাগর সফী হাজির। তিনি তাকে নিজ দেশে নিয়ে গেলেন। লালন পালন করলেন নিজ সন্তানের মত। এক সময় ধর্মান্তরিত করে নাম রাখলেন মুহাম্মদ হাদী। রাজস্ব বিভাগে চাকরি করার সময় মোহাম্মদ হাদীর সুনাম সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সম্রাট তাকে দেওয়ান পদে নিযুক্ত করে ঢাকায় পাঠালেন। পরবর্তীতে তার কর্মস্থল বদল হয় মকসুদাবাদে। তিনি মকসুদাবাদ নাম পরিবর্তন করে এই শহর নিজ নামে রাখলেন "মুর্শিদাবাদ"।
মিনিকেট নামে কোনো চাল নেই!
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার নাতীরা কলহে লিপ্ত হয়। সে সুযোগে বাংলার গভর্নর হয়ে যান মুর্শেদকুলি খাঁ। এমন কি ১৭১৯ সালে বিহারের গভর্নর পদটিও পেয়ে যান দক্ষ প্রসাশক ও বিচক্ষণ মুর্শিদকুলি খাঁ। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার নাতীরা কলহে লিপ্ত হয়। সে সুযোগে বাংলার গভর্নর হয়ে যান মুর্শেদকুলি খাঁ। এমন কি ১৭১৯ সালে বিহারের গভর্নর পদটিও পেয়ে যান দক্ষ প্রসাশক ও বিচক্ষণ মুর্শিদকুলি খাঁ।
সরফরাজ খান
সরফরাজ খান ছিলেন বাংলার দ্বিতীয় নবাব। তার আসল নাম মির্জা আসাদুল্লাহ। সরফরাজ খানের নানা নবাব মুর্শিদ কুলি খান সরফরাজকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব হিসেবে তাঁকে উত্তরাধীকারী মনোনীত করেন। ১৭২৭ সালে মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যুর পর যখন তিনি সিংহাসনে আরোহণ করবেন তখন জানতে পারেন তার পিতা উড়িষ্যার সুবেদার সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান ও তার প্রতিনিধি আলীবর্দী খাঁ বিশাল বাহিনী নিয়ে সিংহাসন দখলের জন্য মুর্শিদাবাদ অগ্রসর হচ্ছেন। পরিবারের মধ্যে কলহ এড়ানোর জন্য তাঁর মাতা দেওজার বেগম তাঁর পিতার সম্মানে সিংহাসন ছেড়ে দিতে বলেন। যাই হোক, পরবর্তীতে সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান তাঁর উত্তরাধীকারী হিসেবে সরফরাজকেই মনোনীত করেন এবং ১৭৩৯ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। সরফরাজ খানের দুর্ভাগ্য যে তিনি আলীবর্দী খাঁর মত একজন প্রতিপক্ষ পেয়েছিলেন যার ৭০ বছর বয়সেও নেতৃত্ত্ব দেওয়ার অসাধারন গুন ছিল এবং তিনি সরফরাজ খানের দূর্বলতাগুলো জানতেন। সরফরাজ খান ভাগীরথী নদীর তীরে গিরকার যুদ্ধে নিহত হন।
সুজাউদ্দৌলা
সুজা-উদ-দৌলা ছিলেন মুঘল প্রধান উজির সফদর জঙের সন্তান। বাল্যকাল থেকে তিনি অধিনস্তদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম ছিলেন যা তাকে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের প্রধান উজির হতে সহায়তা করে। রঘুজি ভোসলে ও তার মারাঠারা বাংলায় হানা দিলে সুজা-উদ-দৌলা আলীবর্দী খানকে বিভিন্ন সময় সহায়তা করেছেন। সফদর জঙের মৃত্যুর পর সুজা-উদ-দৌলা মুঘল সম্রাট আহমেদ শাহ বাহাদুর কর্তৃক আওধের নবাব হিসেবে স্বীকৃত হন।
ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা কেন ৪০ বছর এফবিআইয়ের নজরবন্দী ছিলেন?
১৭৫৪ সাল থেকে পরবর্তী প্রায় ২০ বছর তিনি নবাব হিসেবে শাসন করেছেন। সুজা-উদ-দৌলা ভারতের ইতিহাসে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে ভূমিকা রাখার কারণে অধিক পরিচিত। এগুলো হল পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ এবং বক্সারের যুদ্ধ। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে বিজয়ের ফলে মারাঠা শক্তির আধিপত্য খর্ব হয়। তিনি বক্সারের যুদ্ধে বাংলার নবাব মীর কাশিমের মিত্রপক্ষ ছিলেন তবে এই যুদ্ধে তারা পরাজিত হন।
আলীবর্দি খাঁ
নবাব আলীবর্দী খান বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব ছিলেন। তার ১৭৪০ সাল থেকে পরবর্তী দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে অধিকাংশ সময়ই মারাঠা আক্রমণকারী ও আফগান বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যয় হয়। একজন অসম সাহসী ও রণনিপুণ এবং কর্মদক্ষ সেনাপতি হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। আলীবর্দি বাংলার শাসনব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেন।দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলি ও আফগানদের বিদ্রোহ দমন করে তিনি অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করেন এবং মারাঠা আক্রমণ প্রতিহত করে বাংলার জনসাধারণকে রক্ষা করেন। দীর্ঘদিন যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকার দরুন আলীবর্দীর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিল। ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল তিনি মুর্শিদাবাদে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
সিরাজ-উদ-দৌলা
সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। সিরাজ-উদ-দৌলা তার নানা নবাব আলীবর্দি খানের কাছ থেকে ২৩ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাবের ক্ষমতা অর্জন করেন। তার সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পরের বছর পলাশীর যুদ্ধে তার পরাজয় ও মৃত্যু হয়। এরপরই ভারতবর্ষে ১৯০ বছরের ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়।
আরো পড়ুন :
১। জন্মদিন পালনে ইসলাম কী বলে?
২। ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে যা জানতেই হবে
৩। স্বপ্নে কী এমন ভয়ংকর শাস্তি দেখেছিলেন রাসূল (সা.)?
৪। সালামের সঠিক নিয়ম না জেনে গুনাহ করছেন?
৫। ফেসবুকে মেয়েদের ছবি দেখার আগে সাবধান