Written by : Tanvir Mahatab Abir
বিবাহ। পবিত্র এক সম্পর্ক সৃষ্টির হালাল এক উপায়। বিবাহের ফযিলত সম্পর্কিত একটি হাদিস দিয়ে এই লেখা শুরু করতে চাই।
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন,
” দু’জনের পারস্পরিক ভালোবাসা স্থাপনের জন্য বিবাহের বিকল্প নেই। “
ইবনু মাজাহ, ১৮৪৭
বিবাহের ফযিলত নিয়ে এমন অনেক বর্ণনাই এসেছে হাদিসে। সে নিয়ে না হয় অন্য আরেকদিন আলোচনা করা যাবে। আজকের লেখাটি সীমাবদ্ধ রাখছি রাসূল (সা.) এর বৈবাহিক জীবন নিয়ে।
যদিও ইসলামে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে কিন্তু রাসূল (সা.) এর সর্বমোট ১১ টি বিয়ের কথা জানা যায়। রাসূল (সা.) কি ইসলামী বিধান ভেঙ্গে ছিলেন? নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল এত বিবাহের পেছনে? এসব প্রশ্নেরই উত্তর জানার চেষ্টা করবো এই লেখায়।
শুরুতেই রাসূল (সা.) এর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই। আগেই বলেছি, রাসূল (সা.) ১১ টি বিয়ে করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের সময় তাঁদের নয়জন জীবিত
ছিলেন। দু’জন তাঁর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। এঁরা হচ্ছেন হযরত খাদিজা এবং উম্মুল
মাসাকিন হযরত যয়নব বিনতে খােজায়মা (রা.)।
এছাড়া রাসূল (সা.) এর চারজন দাসীও ছিল। চলুন এদের সকলের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি।
(১) হযরত খাদিজা (রা.)
হিজরতের আগে মক্কায় রাসূল (সা.) এর বয়স যখন ছিলাে পঁচিশ তখন তিনি বিবি খাদিজার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। খাদিজা (রা.) এর তখন বয়স ছিলাে চল্লিশ বছর। প্রথম স্ত্রী খাদিজা (রা.) বেঁচে থাকা অবস্হায় রাসূল (সা.) অন্য কোন বিয়ে করেন নি। নবীজির সন্তানদের মধ্যে একমাত্র হযরত ইব্রাহীম ছাড়া অন্য সবাই ছিলেন বিবি খাদিজার গর্ভজাত। পুত্রদের মধ্যে কেউই জীবিত ছিলেন না। তবে কন্যারা জীবিত ছিলেন।
তাঁদের নাম হচ্ছে হযরত যয়নব, হযরত রােকাইয়া, হযরত উম্মে কুলসুম এবং হযরত ফাতেমা (রা.)।
(২) হযরত সওদা বিনতে জামআ
বিবি খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের কয়েক দিন পর নবীজি নবুয়তের দশম বছরের শওয়াল মাসে এ বিধবার সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন।
(৩) হযরত আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.)
হযরত সওদার সাথে বিয়ের এক বছর পর নবুয়তের একাদশ বর্ষের শাওয়াল মাসে তাঁর সাথে রাসূল (সা.) এর
বিয়ে হয়। সে সময় হযরত আয়েশার বয়স ছিলাে মাত্র ছয় বছর। হিজরতের সাত মাস পরে শাওয়াল মাসের পয়লা তারিখে হযরত আয়েশাকে স্বামীর বাড়ীতে পাঠানাে হয়। সে সময় তাঁর নয় বছর বয়স হয়েছিল এবং তিনি ছিলেন কুমারী। হযরত আয়েশা (রা.) ব্যতীত অন্য কোন কুমারী মেয়েকে নবী করীম (সা.) বিয়ে করেন নি।
(৪) হযরত হাফসা বিনতে ওমর (রা.)
তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন খুনায়েস ইবনে হাযাফা সাহমি (রা.)। বদর ও ওহুদ যুদ্ধের
মাঝামাঝি সময়ে তার স্বামী ইন্তেকাল করেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেসরা হিজরী সালে তাঁর সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন।
(৫) হযরত যয়নব বিনতে খােযায়মা (রা.)
তিনি ছিলেন বনু হেলাল ইবনে আমের ইবনে সাআসাআর সাথে সম্পর্কিত। গরীব
মিসকিনদের প্রতি তাঁর অসামান্য মমত্ববােধ এবং ভালােবাসার কারণে তাঁকে ‘উম্মুল মাসাকিন’
উপাধি প্রদান করা হয়। তিনিও বিধবা ছিলেন। রাসূল (সা.) চতুর্থ হিজরীতে তাঁর সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। আট মাস রাসূলের
স্ত্রী হিসাবে থাকার পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
(৬) উম্মে সালমা হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়া (রা.)
তিনি আবু সালমা (রা.)-এর স্ত্রী ছিলেন। চতুর্থ হিজরীর জমাদিউস সানিতে তিনি বিধবা
হন। একই হিজরী সালের শওয়াল মাসে রাসূল (সা.) তাঁর সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন।
(৭) যয়নব বিনতে জাহাশ ইবনে রিয়াব (রা.)
তিনি ছিলেন বনু আছাদ ইবনে খােযায়মা গােত্রের মহিলা এবং রাসূলের ফুফাতাে
বােন। তাঁর বিয়ে প্রথমে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-এর সাথে হয়েছিলাে। হযরত
যায়েদকে মনে করা হতাে রাসূল (সা.) এর ছেলে। কিন্তু হযরত যায়েদের
সাথে যয়নবের বনিবনা হয়নি, ফলে হযরত যায়েদ তাঁকে তালাক দেন। যয়নবের ইদ্দত শেষ
হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা রব্বুল আলামীন এই আয়াত নাযিল করেন।
“অতপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করলাে, তখন আমি তাকে আপনার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করলাম।” (সূরা আহযাব, আয়াত, ৭)
এ সম্পর্কে সূরা আহযাবে আরাে কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছে। এসব আয়াতে পালক পুত্র সম্পর্কিত বিতর্কের সুষ্ঠু ফয়সালা করে দেয়া হয়েছে। হযরত যয়নবের সাথে পঞ্চম হিজরীর জিলকদ মাসে বা এর কিছু আগে রাসূলের বিয়ে হয়।
(৮) যুয়াইরিয়া বিনতে হারেস (রা.)
তার পিতা ছিলেন খােযাআ গােত্রের শাখা বনু মুস্তালিকের সর্দার। বনু মুস্তালিকের
যুদ্ধবন্দীদের সাথে হযরত জুয়াইরিয়াকেও হাযির করা হয়। তিনি হযরত ছাবেত ইবনে কয়েস
ইবনে শাম্মাস (রা.)-এর ভাগে পড়েছিলেন। হযরত ছাবেত (রা.) শর্ত সাপেক্ষে তাঁকে মুক্তি
দেয়ার কথা জানান। শর্ত হিসাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের কথা বলা হয়। রাসূল (সা.) এ খবর জানার পর হযরত জুয়াইরিয়ার পক্ষ থেকে নির্ধারিত অর্থ পরিশােধ
করে তার মুক্তির ব্যবস্থা করে তাকে বিয়ে করেন। এটা পঞ্চম হিজরীর শাবান মাসের ঘটনা।
(৯) উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা.)
তিনি ছিলেন উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহাশের স্ত্রী। স্বামীর সাথে হিজরত করে তিনি হাবশা
অর্থাৎ আবিসিনিয়া গমন করেন। সেখানে যাওয়ার পর উবায়দুল্লাহ ধর্মান্তরিত হয়ে খৃষ্টান ধর্ম
গ্রহণ করেন। পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু উম্মে হাবিবা নিজের ধর্ম বিশ্বাস এবং হিজরতের
ওপর অটল ছিলেন। সপ্তম হিজরীর মহররম মাসে নবীজি আমর ইবনে উমাইয়া জামিরিকে
একখানি চিঠিসহ আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশির কাছে প্রেরণ করেন। সে চিঠিতে রাসূল (সা.) উম্মে হাবিবাকে বিয়ে করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। নাজ্জাশী উম্মে
হাবিবার সম্মতি সাপেক্ষে রাসূলের সাথে তার বিয়ে দেন এবং তাকে শরহাবিল ইবনে
হাসানার সাথে নবীজির কাছে প্রেরণ করেন।
(১০) হযরত সফিয়া বিনতে হুয়াই (রা.)
তিনি ছিলেন বনু ইসরাইল সম্প্রদায়ের এবং তিনি খয়বরে বন্দী হন। সপ্তম হিজরীতে খয়বর
বিজয়ের পর রাসূল (সা.) এর পছন্দক্রমে তাঁর সাথে রাসূলের বিয়ে হয়।
(১১) হযরত মায়মুনা বিনতে হারেস (রা.)
তিনি ছিলেন উম্মুল ফযল লােবাবা বিনতে হারেসের বােন। সপ্তম হিজরীর যিলকদ মাসে
‘ওমরায়ে কাযা’ শেষ করে এবং সঠিক কথা অনুযায়ী এহরাম থেকে হালাল হওয়ার পর রাসূল (সা.) তাঁকে বিয়ে করেন।
দাসীদের প্রসঙ্গে আসি৷
রাসূল (সা.) দু’জন দাসী ছিলেন। এদের একজন হচ্ছেন মারিয়া কিবতিয়া। মিসরের শাসনকর্তা মােকাওকিস তাকে
উপটৌকন হিসাবে প্রেরণ করেন। তার গর্ভ থেকে নবীজির সন্তান হযরত ইব্রাহীম জন্ম
নেন।
অন্য একজন দাসীর নাম ছিলাে রায়হানা, তিনি বনু নাযির বা বনু কোরায়যা গােত্রের
অন্তর্ভুক্ত। বনু কোরায়যা গােত্রের যুদ্ধবন্দীদের সাথে তিনি মদীনায় আসেন। রাসূল (সা.)
রায়হানাকে পছন্দ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। গবেষকদের ধারণা এই যে, নবীজি তাঁকে মুক্ত করে বিয়ে করেন। তবে মতভেদ আছে বিয়ে করা না করা নিয়ে। আবু ওবায়দা
লিখেছেন, উল্লিখিত দু’জন দাসী ছাড়াও রাসূল (সা.) এর আরাে দুজন দাসীও ছিলাে, এদের এক জনের নাম ছিলাে জামিলা। তিনি একটি যুদ্ধে যুদ্ধবন্দী হিসাবে গ্রেফতার হন। অন্য একজন দাসীকে নবী সহধর্মিনী হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রা.) রাসূলকে হেবা (কোনো রকম বিনিময় ছাড়া দান) করে দেন।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক।
ইসলামী যে চারটি বিবাহেরই অনুমতি দেয়া হয়েছে সেটির প্রমাণ পাওয়া যায় কুরআনের সূরা আন নিসা’য়।
“আর যদি তোমরা আশংকা কর যে, ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিয়ে করবে নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে, দুই, তিন বা চার; আর যদি আশংকা কর যে সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকেই বা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকেই গ্রহণ কর। এতে পক্ষপাতিত্ব না করার সম্ভাবনা বেশী। ” (সূরা আন নিসা, আয়াতঃ ০৩)
হাদিসেও এসেছে চারটি বিয়ের বিষয়টি৷
কায়েস ইবনুল হারিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং তখন আমার আটজন স্ত্রী ছিল। আমি রাসূল (সা.) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তাঁকে জানালাম। তিনি বলেনঃ তাদের মধ্যে তোমার পছন্দমত চারজনকে রেখে দাও। (ইবনু মাজাহ, ১৯৫২)
কিন্তু রাসূল (সা.) কেন নিজেই চারটির অধিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন?
রাসূল (সা.) তাঁর উম্মতের চেয়ে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী
ছিলেন। তিনি বিভিন্ন উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে চারটির বেশী বিয়ে করার অনুমতি পেয়েছিলেন।
রাসূল (সা.) হযরত আয়েশা এবং হযরত হাফসাকে বিয়ে করে হযরত আবু বকর এবং হযরত ওমরের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছিলেন। একই ভাবে হযরত ওসমান
(রা.)-এর হাতে পরপর দুই কন্যাকে তুলে দিয়ে এবং হযরত আলীর সাথে প্রিয় কন্যা হযরত
ফাতেমার বিয়ে দিয়ে নবীজি উল্লিখিত চারজন সাহাবীর সম্পর্কে
ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন। কেননা উক্ত চারজন সাহাবী ইসলামের ক্রান্তিকালে
ইসলামের সৈনিক হিসাবে অতুলনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার পরিচয় দিয়েছিলেন।
আরবের নিয়ম ছিলাে যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। জামাতা সম্পর্ক
আরবদের দৃষ্টিতে বিভিন্ন গােত্রের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
জামাতার সাথে যুদ্ধ করাকে তারা মনে করে লজ্জাজনক। এই নিয়মের কারণে নবীজি
বিভিন্ন গােত্রের ইসলামের প্রতি শত্রুতার শক্তি খর্ব করতে বিভিন্ন গােত্রের মহিলাদের সাথে
বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, হযরত উম্মে সালমা ছিলেন বনু মাখযুম গােত্রের অধিবাসী। এই গােত্রের অধিবাসী ছিলাে আবু জেহেল এবং খালেদ ইবনে ওলীদ।
এই গােত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পর খালেদ ইবনে ওলীদের মধ্যে ইসলামের প্রতি তেমন
প্রবল শত্রুতা লক্ষ্য করা যায়নি। বরং কিছুকাল পর তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
এমনিভাবে রাসূল (সা.) আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবিবাকে বিয়ে
করার পর আবু সুফিয়ান ইসলামের শত্রুতা করলেও কখনাে রাসূলের সামনে আসেননি।
হযরত যােয়াইরিয়া এবং হযরত সফিয়া নবীজির সাথে বিয়ে হওয়ার পর বনু মুস্তালেক এবং বনু নাযির গােত্র ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ছেড়ে দেয়। এই দু’টি গােত্রে রাসূুল (সা.) এর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পর এরা ইসলামের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
নবীজি তাঁকে বিয়ে করার
পর সাহাবায়ে কেরাম উক্ত গােত্রের একশত যুদ্ধবন্দী পরিবারকে বিনাশর্তে মুক্তি দেন। তারা
বলছিলেন যে, এরা তাে রাসূলের শ্বশুর পক্ষের লােক। গােত্রের লােকদের মনে এই দয়ার অসামান্য প্রভাব পড়েছিলাে।
এ কারণেই আমরা লক্ষ্য করি যে, দাম্পত্য জীবন তথা পারিবারিক জীবনের রীতিনীতি শিক্ষা
দিতে উম্মুল মােমেনীনরা বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষত যাঁরা দীর্ঘায়ু হয়েছিলেন তারা
এ দায়িত্ব পালনের সুযােগ বেশী পেয়েছিলেন। যেমন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রঃ)-এর কথা
উল্লেখ করা যায়। তিনি নবী জীবনের কথা ও কাজের বর্ণনা ব্যাপকভাবে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে আসা তাঁর বর্ণনা সকলে বিনাবাক্যে মেনে নেন। বিতর্ক আছে কম বয়সে আয়েশা (রা.) কে বিয়ে করা নিয়ে। তবে রাসূল (সা.) আল্লাহর নির্দেশেই এই বিয়ে করেছিলেন।
‘আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাকে (‘আয়িশাহকে) বিয়ে করার আগে দু’বার আমাকে দেখানো হয়েছে। আমি দেখেছি, একজন ফেরেশতা তোমাকে রেশমী এক টুকরা কাপড়ে জড়িয়ে বয়ে নিয়ে আসছে। আমি বললাম, আপনি নিকাব সরিয়ে দিন। যখন সে নিকার সরিয়ে দিল তখন আমি দেখতে পেলাম যে, সেই মহিলা তুমিই। আমি তখন বললাম, এটা যদি আল্লাহর তরফ থেকে হয়ে থাকে তাহলে তিনি তা সত্যে পরিণত করবেন। এরপর আবার আমাকে দেখানো হল যে, ফেরেশতা তোমাকে রেশমী এক টুকরা কাপড়ে জড়িয়ে বহন করে নিয়ে আসছে। আমি বললাম, আপনি (তার নিকাব) সরিয়ে দিন। সে তা সরিয়ে দিলে আমি দেখতে পাই যে, সেই মহিলা তুমিই। তখন আমি বললামঃ এটা যদি আল্লাহর তরফ থেকে হয়ে থাকে তাহলে তিনি সত্যে পরিণত করবেন। (সহীহ বুখারী, ৩৮৯৫)
রাসূল (সা.) এর একটি বিষয় জাহেলী যুগের রীতি-নীতি নস্যাৎ করে দিয়েছিলাে। আরব সমাজে এই কুসংস্কার যুগ যুগ ধরে চলে আসছিলাে। নিয়ম ছিলাে যে,
পালকপুত্র হিসাবে কাউকে গ্রহণ করলে সে আসল পুত্রের মর্যাদা ও অধিকার ভােগ করবে। এই নিয়ম আরব সমাজ থেকে বিলােপ করা মােটেই সহজ ছিলাে না। অথচ এই নিয়ম ইসলামের বিয়ে, তালাক, সম্পত্তি আইন এবং অন্যান্য বিষয়ের সাথে
ছিলাে মারাত্মকভাবে সংঘাতপূর্ণ। এছাড়া জাহেলী যুগের এই কুসংস্কার এমন সব নির্লজ্জ
কার্যকলাপ এবং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছিলাে যে, সেসব থেকে সমাজদেহকে মুক্ত করা ইসলামের
অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলাে।
জাহেলী যুগের এই কুসংস্কার নির্মূল করার উদ্দেশ্যেই স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীন রাসূল (সা.) এর সাথে হযরত যয়নব বিনতে
জাহাশের বিয়ে করান।
হযরত যয়নব প্রথমে হযরত যায়েদের স্ত্রী ছিলেন। আর যায়েদ ছিলেন নবীজির পালকপুত্র। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় হযরত যায়েদ
স্ত্রীকে তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এটা ছিলাে সে সময়ের কথা যখন সকল কাফের ছিলাে
আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। কাফেররা সেই সময় খন্দকের যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাে।
এদিকে পালকপুত্র বিষয়ক সমস্যা সমাধানের জন্যে আল্লাহর নির্দেশ ঘােষিত হয়েছে। নবীজি ধারণা করলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি যায়েদ তার স্ত্রীকে
তালাক দেন এবং নবীজিকে যদি যায়েদের পরিত্যক্ত স্ত্রীকে বিয়ে করতে হয়, তাহলে মােনাফেক মােশরেক এবং ইহুদীরা সুযোগ পেয়ে রাসূলের বিরুদ্ধে প্রবল প্রােপাগান্ডা শুরু করবে ও সরল প্রাণ মুসলমানদের মন
বিষিয়ে তােলার চেষ্টা করবে। তাই নবীজি এই চেষ্টাই করলেন যেন
হযরত যায়েদ তার স্ত্রীকে তালাক না দেন। এতে যায়েদের স্ত্রীকে নবীজির বিয়ে করার প্রশ্নও উঠবে না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এটা পছন্দ করলেন না।
আল্লাহ তায়ালা তার রসূলের প্রতি রূঢ় বক্তব্য সম্বলিত এই আয়াত নাযিল করলেন, “স্মরণ কর, আল্লাহ তায়ালা যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছাে তুমি তাকে বলছিলে, তুমি তােমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখাে এবং আল্লাহকে ভয় করাে। তুমি তােমার অন্তরে যা গােপন করছে আল্লাহ তায়ালা তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন, তুমি লােকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকে
ভয় করাই তােমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত।” (সূরা আহযাব, আয়াত ৩৭)
অবশেষে হযরত যায়েদ হযরত যয়নবকে তালাক দেন। এরপরে ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যায়।
আল্লাহ তায়ালা তখন হযরত যয়নবকে বিয়ে করতে নবীজির প্রতি নিজ ফয়সালা জানিয়ে দেন। আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলের
জন্যে এই বিয়ে অত্যাবশ্যকীয় করেন। দেরী করার কোন অবকাশও রাখা হয়নি।
পবিত্র কোরআনের বক্তব্য এরূপ, “অতপর যায়েদ যখন তার সাথে বিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করলাে তখন আমি তাকে তােমার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করলাম যাতে মােমেনদের পােষ্যপুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিয়ে ছিন্ন করলে সেই সব রমণীকে বিয়ে করা মােমেনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ
কার্যকর হয়েই থাকে। “(সূরা আহযাব, আয়াত ৩৭)
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিলাে এই যে, পালিতপুত্রের ব্যাপারে জাহেলী যুগের রীতি নীতি তথা
বদ্ধমূল কুসংস্কারের মূলােৎপাটন।
সমাজ জীবনে কোন রেওয়ায বদ্ধমূল হয়ে গেলে
তখন শুধুমাত্র কথা দিয়ে তার মূলােউৎপারটন করা যায় না। সেই রেওয়াজের পরিবর্তন সাধনের
জন্যে শুধু কথাই যথেষ্ট নয় বরং যিনি পরিবর্তন চান তাকে কাজের মাধ্যমে বাস্তব দৃষ্টান্ত
উপস্থাপন করতে হয়। সেই দৃষ্টান্ত স্হাপন করতে গিয়েও রাসূলকে বিবাহের মত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ
১/ আর রাহীকুল মাখতূম
২/ আল কোরআন
৩/ সহীহ্ বুখারী
৪/ ইবনু মাজাহ
আরো পড়ুন :
১। জন্মদিন পালনে ইসলাম কী বলে?
২। ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে যা জানতেই হবে
৩। স্বপ্নে কী এমন ভয়ংকর শাস্তি দেখেছিলেন রাসূল (সা.)?